জুয়াড়ি

জুয়াড়ি [Story]

বদ অভ্যাস থেকে মানুষের নিস্তার সহজে মেলে না। বদরুল মিয়া জুয়ার নেশা ছাড়তে পারে না। কিন্তু ইদানিং জুয়ার সাথে সাথে সে চরম এক মদখোর মানুষে পরিণত হয়েছে। মানুষ যেমন না খেয়ে বেশী দিন বাঁচতে পারে না, তেমনি তার কাছে জুয়া এবং মদ হচ্ছে জীবনের আরেক নাম। 

 

ঘরে অসুস্থ বউ সাদিয়া আক্তারকে ফেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বদরুল স্বচ্ছন্দে বাইরে কাটিয়ে দেয়। একটা ছোটখাটো চাকরি ছিল কিন্তু তার বদ অভ্যাসের কারণে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এখন নানা জনের কাছ থেকে টাকা ধার করে করেই তার দিন যায়।

 

ঘরে অসুস্থ বউটা দিন দিন রোগা হতে হতে যেন কংকালে পরিণত হয়েছে। ঘরে দানা পানি আছে কিনা সে ব্যাপারে বদরুলের কোনও চিন্তা নেই। সে মানুষের কাছ থেকে ধার করে আর মদ খেয়ে মাতাল হয়ে এখানে ওখানে পড়ে থাকে।

 

সাদিয়ার প্রতিবেশী তারা খাতুন তাকে বাপের বাড়ি চলে যেতে বলেছে। এমন কুলাঙ্গার স্বামীর ঘরে অন্তত ধুঁকে ধুঁকে মরতে হবে না। কিন্তু সাদিয়ার যে আপন কেউ বেঁচে নেই। কে দিবে ঠাই তাকে। তাছাড়া তার অসুস্থ শরীরটাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার মত বিন্দুমাত্র শক্তি অবশিষ্ট নেই।

 

        তারার কাছে সাদিয়া চির ঋণী হয়ে থাকবে। তার সাহায্য না পেলে সে হয়তো এত দিনে পরপারে চলে যেত। যখনই সম্ভব হয়েছে তারা তাকে অর্থ দিয়ে এবং খাবার দাবার দিয়ে সহায়তা করেছে। বর্তমান যুগে যেখানে কেউ রাস্তায় দুর্ঘটনা কবলিত হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকলেও মানুষ দেখেও না দেখার ভান করে, সেখানে তারার মত দয়ালু এবং অমায়িক মানুষ পাওয়া খুবই সৌভাগ্যের বিষয়।

 

        তারা যেভাবে সাদিয়ার সাহায্যে এগিয়ে এসেছে তেমনটা কেউ নিজের আপন আত্মীয়ের ক্ষেত্রে করে কি না সন্দেহ আছে। যাইহোক, প্রতি রাতে বদরুল মাতাল হয়ে ফিরে আর সাদিয়ার উপর ক্রুদ্ধ স্বরে কথা বলে। মাঝে মাঝে রাত দুইটা কিংবা তিনটার সময় ফিরে এসে সাদিয়ার সাথে অহেতুক চেঁচামেচি করে।

 

        শুধু সাদিয়া নয়, এলাকার সাধারণ মানুষও বদরুলের এমন বিবেচনাহীন কাণ্ড কারখানায় অতিষ্ঠ। একদিন এলাকার মসজিদের ইমাম সাহেব তাকে একান্তে ডেকে নিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করেন কিন্তু সে ওনার কোনও কথাতেই পাত্তা না দিয়ে রীতিমত ধমক দিয়ে সেখান থেকে চলে যায়।

 

আল্লাহ্‌কে ডাকা ছাড়া সাদিয়ার আর কোনও পথ খোলা নেই। উত্তপ্ত সূর্যের দিকে তাকানোর পর মানুষ যেমন কয়েক সেকেন্ড অন্ধের মত হয়ে যায়, সাদিয়ার অবস্থা হয়েছে সেই রকম। সে যেন দু চোখে অন্ধকার দেখছে। সীমাহীন দুশ্চিন্তা মাঝে মাঝে তাকে নিজের জীবনটাকে শেষ করার কথা মনে করিয়ে দেয়।

 

যতক্ষণ তারার সাথে কথা বলে, ততক্ষণ সাদিয়া খুব ভরসা এবং সাহস পায়। তারাকে দেখলেই মনে হয় জীবন কত সুন্দর! কিন্তু বদরুল ঘরে প্রবেশ করা মানেই একটা ঘূর্ণিঝড় তার ঘরের মধ্যে প্রবেশ করা, যেন সেই ঝড় অনন্তকালের জন্য সাদিয়ার আশেপাশে ঘুরপাক খেতেই থাকবে!

 

একদিন সাদিয়া ভয়ঙ্কর একটা দুঃস্বপ্ন দেখে ভয়ে চিৎকার দিয়ে বিছানায় উঠে বসে। সে দেখতে পায় যে সে তার স্বামীর গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে চিরতরে কোথাও চলে গেছে।

 

বদরুলকে এখন আর মানুষ ধার দেয় না। কারণ সে ধার নেয় ঠিকই কিন্তু টা পরিশোধ করতে পারে না। এলাকার মানুষ তাকে এখন বাটপার বলে ডাকে। এতে অবশ্য তার কিছু যায় আসে না কারণ সে রাস্তার কুকুরের মত হয়ে গেছে; তার কাছে আত্মসম্মান বলে কিছুই নেই।

 

এখন মদ কিনতে না পেরে সে চুরি করা শুরু করেছে। একদিন সাদিয়ার একটি স্বর্ণের আংটি চুরি করে বিক্রি করে দিয়েছে মদ কেনার পয়সা যোগাড় করতে। সাদিয়া এখন আর বদরুলের সাথে এসব ব্যাপারে কোনও কথাই বলে না। সে যেন একটি মূর্তিতে পরিণত হয়েছে।

 

সাদিয়া বুঝে গেছে যে বদরুলকে শোধরানো তার সাধ্যের বাইরে। তার সাথে তর্ক করা আর উলুবনে মুক্তো ছড়ানো একই কথা! একরাতে ঘরে আগুন লাগে। আগুনের লেলিহান শিখা যেন উন্মাদের মত নৃত্য করছে। গভীর রাত হওয়ায় আশেপাশের মানুষের আগুন লাগার ব্যাপারটা বুঝতে একটু দেরী হয়েছে।

 

         পাশের বাড়ির তারা যখন ছুটে আসে ততক্ষণে সব শেষ। তারার দু চোখ বেয়ে পানি বৃষ্টির মত ঝরতে থাকে। সাদিয়ার জন্য তার মনটা খুব বিষণ্ণ হয়ে যায়। পুলিশ এসে তদন্ত করে দেখে যে ঘরে কোনও মহিলার লাশ নেই, শুধুমাত্র বদরুলের লাশ পড়ে আছে। মেঝেতে কেরোসিনের উপস্থিতি শনাক্ত করা গেছে। সাদিয়ার কোনও খবর পাওয়া যাচ্ছে না।

View kingofwords's Full Portfolio